ট্রান্সজেন্ডার কি: ধারণা, প্রকারভেদ এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে একটি বিস্তৃত আলোচনা
বর্তমান বিশ্বে লিঙ্গ পরিচয় বা জেন্ডার আইডেন্টিটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল আলোচনার বিষয়। আমাদের সমাজে দীর্ঘকাল ধরে নারী এবং পুরুষ—এই দ্বৈত লিঙ্গ কাঠামোর বাইরে অন্য যেকোনো পরিচয়কে অস্বাভাবিক বা প্রান্তিক বলে মনে করা হতো। কিন্তু বিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব এবং মানবাধিকারের অগ্রগতির সাথে সাথে আমরা জানতে পেরেছি যে লিঙ্গ পরিচয় কেবল শারীরিক গঠনের ওপর নির্ভর করে না। এখানেই ‘ট্রান্সজেন্ডার’ বা রূপান্তরকামী ধারণাটি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
অনেকেই ট্রান্সজেন্ডার, হিজড়া এবং ইন্টারসেক্স বিষয়গুলোকে গুলিয়ে ফেলেন। কিন্তু এগুলোর মধ্যে সূক্ষ্ম এবং গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। আপনি যদি এই বিষয়টি সম্পর্কে গভীরভাবে জানতে চান, তবে এই আর্টিকেলটি আপনার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে। এখানে আমরা আলোচনা করব ট্রান্সজেন্ডার কারা, কেন মানুষ ট্রান্সজেন্ডার হয়, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তাদের অধিকার এবং ট্রান্সজেন্ডার কি—এ সংক্রান্ত যাবতীয় ভুল ধারণার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
১. ট্রান্সজেন্ডার বা রূপান্তরকামী বলতে কী বোঝায়?
সহজ কথায়, একজন ব্যক্তির জন্মের সময় চিকিৎসকরা তার শারীরিক গঠন দেখে যে লিঙ্গ নির্ধারণ করে দেন (Assigned Sex at Birth), বড় হওয়ার পর যদি সেই ব্যক্তি মানসিকভাবে নিজেকে সেই লিঙ্গের বলে মনে না করেন, তবে তাকে ট্রান্সজেন্ডার বলা হয়।
ট্রান্সজেন্ডার একটি ‘আমব্রেলা টার্ম’ (Umbrella Term)। এর অধীনে বিভিন্ন লিঙ্গ বৈচিত্র্যের মানুষ অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। এটি কোনো রোগ নয়, বরং এটি মানুষের বৈচিত্র্যময় সত্তার একটি অংশ। অনেক সময় সমাজের বিরূপ আচরণের কারণে তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন, তখন মাথা থেকে বাজে চিন্তা দূর করার উপায় খোঁজা তাদের জন্য জরুরি হয়ে পড়ে।
২. সেক্স (Sex) এবং জেন্ডার (Gender)-এর পার্থক্য
ট্রান্সজেন্ডার বিষয়টি বুঝতে হলে প্রথমে আমাদের ‘সেক্স’ এবং ‘জেন্ডার’-এর পার্থক্য বুঝতে হবে। জীববিজ্ঞানের ভাষায় এই দুটি শব্দ এক নয়।
- সেক্স (Sex): এটি একটি জৈবিক বা বায়োলজিক্যাল বিষয়। ক্রোমোজোম (XX বা XY), হরমোন এবং প্রজনন অঙ্গের ওপর ভিত্তি করে এটি নির্ধারিত হয় (যেমন: পুরুষ বা নারী)।
- জেন্ডার (Gender): এটি একটি সামাজিক ও মানসিক কাঠামো। সমাজ কীভাবে একজন নারী বা পুরুষের আচরণ, পোশাক বা ভূমিকা আশা করে এবং ব্যক্তি নিজে অন্তরে কী অনুভব করে—তা হলো জেন্ডার।
একজন সিসজেন্ডার (Cisgender) ব্যক্তির ক্ষেত্রে তার সেক্স এবং জেন্ডার একই হয় (জন্মগত পুরুষ এবং মনেও পুরুষ)। কিন্তু একজন ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই দুটির মিল থাকে না।
৩. ট্রান্সজেন্ডার বর্ণালীর বিভিন্ন ভাগ
আগেই বলা হয়েছে, ট্রান্সজেন্ডার একটি বিস্তৃত শব্দ। এর মধ্যে বিভিন্ন পরিচয় থাকতে পারে:
ট্রান্স ম্যান (Trans Man)
যিনি জন্মগতভাবে নারী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিলেন, কিন্তু মানসিকভাবে নিজেকে পুরুষ মনে করেন এবং পুরুষের মতো জীবনযাপন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
ট্রান্স ওম্যান (Trans Woman)
যিনি জন্মগতভাবে পুরুষ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিলেন, কিন্তু মানসিকভাবে নিজেকে নারী মনে করেন।
নন-বাইনারি (Non-Binary)
যিনি নিজেকে পুরোপুরি পুরুষ বা পুরোপুরি নারী—কোনো ক্যাটাগরিতেই ফেলেন না। তাদের জেন্ডার অনুভূতি এই দুইয়ের মাঝামাঝি বা সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে।
হিজড়া (Hijra) – দক্ষিণ এশীয় প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশ ও ভারতে ‘হিজড়া’ একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিচয়। হিজড়ারা সাধারণত এমন সম্প্রদায়ভুক্ত যারা নিজেদের পরিবার ছেড়ে গুরুর অধীনে সংঘবদ্ধভাবে বসবাস করেন। সব ট্রান্সজেন্ডার হিজড়া নন, আবার সব হিজড়া ট্রান্সজেন্ডার নাও হতে পারেন (অনেকে ইন্টারসেক্সও হতে পারেন)।
৪. হিজড়া, ট্রান্সজেন্ডার ও ইন্টারসেক্স: পার্থক্য কী?
| বিষয় | ট্রান্সজেন্ডার (Transgender) | ইন্টারসেক্স (Intersex) | হিজড়া (Hijra) |
|---|---|---|---|
| মূল সংজ্ঞা | মানসিক লিঙ্গ পরিচয় শারীরিক লিঙ্গের চেয়ে ভিন্ন। | জন্মগতভাবে প্রজনন অঙ্গ বা ক্রোমোজোমে নারী-পুরুষের মিশ্র বৈশিষ্ট্য থাকে। | দক্ষিণ এশিয়ার একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক ও সামাজিক গোষ্ঠী। |
| শারীরিক গঠন | জন্মগতভাবে স্পষ্ট নারী বা পুরুষাঙ্গ থাকে। | প্রজনন অঙ্গ অস্পষ্ট বা মিশ্র হতে পারে। | শারীরিক বা মানসিক উভয় কারণেই হতে পারে। |
| চিকিৎসা/সার্জারি | অনেকে লিঙ্গ পরিবর্তন সার্জারি (SRS) করান, অনেকে করান না। | অনেকে ছোটবেলায় বা বড় হয়ে সার্জারি করান। | অনেকে নির্বাণ বা ক্যাস্ট্রেশন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যান। |
৫. কেন মানুষ ট্রান্সজেন্ডার হয়? বিজ্ঞান কী বলে?
এটি কোনো মানসিক বিকৃতি বা ‘শখ’ নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে:
- হরমোনাল প্রভাব: মাতৃগর্ভে ভ্রূণের বিকাশের সময় মস্তিষ্কের বিকাশ এবং শারীরিক লিঙ্গের বিকাশের সময় হরমোনের তারতম্য ঘটলে এমনটি হতে পারে।
- মস্তিষ্কের গঠন: নিউরোসায়েন্স গবেষণায় দেখা গেছে, একজন ট্রান্স নারীর মস্তিষ্কের গঠন জন্মগত পুরুষের চেয়ে সিসজেন্ডার নারীর মস্তিষ্কের সাথে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ হতে পারে।
- জেনেটিক কারণ: কিছু ক্ষেত্রে জিনের প্রভাবও থাকতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।
৬. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ট্রান্সজেন্ডারদের বাস্তবতা
বাংলাদেশে ২০১৩ সালে সরকার হিজড়া জনগোষ্ঠীকে ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এটি একটি বিশাল পদক্ষেপ হলেও, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এখনো অনেক দূরে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নের বেদনা এবং সমাজের লাঞ্ছনা তাদের নিত্যসঙ্গী। অনেক সময় তাদের আত্মীয় স্বজন নিয়ে কষ্টের স্ট্যাটাস দিতে দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, যা তাদের মানসিক যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ।
পারিবারিক ও সামাজিক বাধা
অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবার তাদের মেনে নিতে চায় না। ফলে খুব অল্প বয়সে তারা ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়। শিক্ষা, বাসস্থান এবং কর্মসংস্থানের অভাব তাদের মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য করে। নারীদের সমস্যা নিয়ে আমরা অনেক কথা বলি, যা আপনি বাংলাদেশের নারীদের সমস্যা বিষয়ক আর্টিকেলে জানতে পারবেন, কিন্তু ট্রান্সজেন্ডারদের সমস্যা আরও গভীর এবং বহুমুখী।
আইনি ও কর্মসংস্থান
ভোটার আইডি কার্ডে ‘হিজড়া’ অপশন থাকলেও, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি বা চাকরিতে তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোটা বা সুযোগ এখনো অপ্রতুল। তবে আশার কথা হলো, বর্তমানে কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের নিয়োগ দিচ্ছে।
৭. জেন্ডার ট্রানজিশন বা রূপান্তর প্রক্রিয়া
একজন ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি তার মানসিক লিঙ্গ পরিচয়ের সাথে মিল রেখে নিজেকে পরিবর্তন করতে পারেন। একে ট্রানজিশন বলে। এটি তিনভাবে হতে পারে:
- সামাজিক ট্রানজিশন: নাম পরিবর্তন, পোশাক-আশাক পরিবর্তন এবং পছন্দের সর্বনাম (He/She) ব্যবহার করা।
- মেডিকেল ট্রানজিশন: হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (HRT) এবং সার্জারি (যেমন: ব্রেস্ট অগমেন্টেশন বা জেন্ডার রিঅ্যাসাইনমেন্ট সার্জারি)।
- আইনি ট্রানজিশন: পাসপোর্টে বা আইডি কার্ডে নাম ও লিঙ্গ পরিবর্তন করা।
এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং জটিল। এই সময়ে তাদের প্রচুর মানসিক সমর্থনের প্রয়োজন হয়। বিষণ্নতা গ্রাস করলে হতাশা থেকে সফলতার গল্প পড়ে তারা অনুপ্রেরণা পেতে পারেন।
৮. ভুল ধারণা বনাম সঠিক তথ্য
আমাদের সমাজে ট্রান্সজেন্ডারদের নিয়ে অনেক কুসংস্কার প্রচলিত আছে। আসুন জেনে নিই আসল সত্য:
ভুল ধারণা: ট্রান্সজেন্ডার হওয়া একটি মানসিক রোগ।
সত্য: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে এটি কোনো মানসিক রোগ নয়।
ভুল ধারণা: তারা কেবল হিজড়া বৃত্তির জন্যই এমনটা করে।
সত্য: কর্মসংস্থানের অভাবেই অনেকে বাধ্য হয়ে ভিক্ষাবৃত্তি বা হিজড়া পেশায় যান। সুযোগ পেলে তারাও ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা সাংবাদিক হতে পারেন।
৯. সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
উত্তর: না, হিজড়া দক্ষিণ এশিয়ার একটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিচয়। সব ট্রান্সজেন্ডার হিজড়া কমিউনিটির অংশ নন।
উত্তর: একদমই না। এটি কোনো ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া ঘটিত রোগ নয়। এটি একান্তই ব্যক্তিগত এবং জৈবিক সত্তা।
উত্তর: বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার প্রাপ্য। ২০১৩ সাল থেকে তারা ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃত, তবে উত্তরাধিকার ও বিবাহ সংক্রান্ত আইন এখনো স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে আরও জানতে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা আইন সম্পর্কে পড়া জরুরি।
উপসংহার
ট্রান্সজেন্ডার মানুষ ভিনগ্রহের কোনো প্রাণী নন; তারা আমাদেরই সন্তান, ভাই, বোন বা বন্ধু। প্রকৃতির বিচিত্র খেলায় তাদের দেহ ও মনের গঠন ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তাদের অনুভূতি, স্বপ্ন এবং ভালোবাসার ক্ষমতা আমাদের মতোই। একটি সুস্থ ও মানবিক সমাজ গড়তে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে।
আসুন, কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলে তাদের মানুষ হিসেবে সম্মান করি। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিই, যাতে তারাও সমাজের মূলধারায় অবদান রাখতে পারে। মনে রাখবেন, জীবন কীভাবে সুন্দর করা যায় তা নির্ভর করে আমাদের উদার মানসিকতার ওপর।
আপনি কি আপনার জেন্ডার আইডেন্টিটি নিয়ে বিভ্রান্ত?
মনে রাখবেন, আপনি একা নন। সঠিক কাউন্সিলিং এবং তথ্যের জন্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
আরও আর্টিকেল পড়ুন


