কোটা কী: ধারণা, ইতিহাস এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘কোটা’ শব্দটি অত্যন্ত আলোচিত এবং বিতর্কিত একটি বিষয়। সরকারি চাকরি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি—সর্বত্রই এই কোটা ব্যবস্থার প্রভাব রয়েছে। সম্প্রতি কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। কিন্তু আপনি কি জানেন কোটা কী এবং এর ইতিহাস আসলে কতটা পুরোনো?
সহজ কথায়, কোটা হলো রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের এমন একটি বিশেষ ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী বা বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক পদ বা সুযোগ সংরক্ষণ করা হয়। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা কোটা ব্যবস্থার আদ্যপান্ত, এর ঐতিহাসিক পটভূমি এবং বর্তমান সময়ে এর প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
১. কোটা কী? (What is Quota System?)
বিশ্বের অনেক দেশেই একে ‘Affirmative Action’ বা ‘Positive Discrimination’ বলা হয়। এর মূল লক্ষ্য হলো সমতা নিশ্চিত করা। তবে অনেক সময় এই ব্যবস্থা মেধার অবমূল্যায়ন করছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ঠিক যেমন জনসংখ্যায় নারী ও পুরুষের সংখ্যা তুলনা করা হয় সমতার খাতিরে, তেমনই কোটাও একটি সমতা আনার প্রয়াস।
২. বাংলাদেশে কোটা ব্যবস্থার ইতিহাস
বাংলাদেশে কোটা ব্যবস্থার প্রবর্তন হয় স্বাধীনতার পরপরই। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার প্রথম কোটা ব্যবস্থা চালু করে। তখন এর মূল উদ্দেশ্য ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত নারীদের পুনর্বাসন।
ঐতিহাসিক পরিক্রমা:
- ১৯৭২: সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ৩০%, যুদ্ধাহত নারীদের জন্য ১০% এবং জেলা কোটা ৪০% চালু হয়। মেধা কোটা ছিল মাত্র ২০%।
- ১৯৭৬: মেধা কোটা বাড়িয়ে ৪০% করা হয়।
- ১৯৮৫: মেধা কোটা ৪৫% করা হয়। নারীদের জন্য ১০% এবং উপজাতিদের জন্য ৫% কোটা রাখা হয়।
- ১৯৯৭: মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদেরও কোটার অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
- ২০১৮: ব্যাপক ছাত্র আন্দোলনের মুখে সরকার ১ম ও ২য় শ্রেণির চাকরিতে কোটা বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে।
এই ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কোটা ব্যবস্থার পরিবর্তন সবসময়ই রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল ছিল। অনেক সময় বাংলাদেশ রাজনৈতিক অস্থিরতা এই কোটা ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করেও দানা বেঁধেছে।
৩. কোটা বনাম মেধা: যুক্তিতর্ক
কোটা ব্যবস্থা থাকা উচিত কি না, তা নিয়ে পক্ষে ও বিপক্ষে নানামুখী যুক্তি রয়েছে।
| কোটার পক্ষে যুক্তি (Pro-Quota) | কোটার বিপক্ষে যুক্তি (Anti-Quota) |
|---|---|
| অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা। | মেধাবীদের প্রতি বৈষম্য করা হয়। |
| মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন। | যোগ্য প্রার্থীর অভাবে পদ শূন্য থাকে। |
| নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা। | প্রশাসনিক দক্ষতায় ঘাটতি দেখা দেয়। |
| আদিবাসী ও প্রতিবন্ধীদের অধিকার রক্ষা। | সংবিধানে বর্ণিত সমান সুযোগের পরিপন্থী হতে পারে। |
তবে এটা অনস্বীকার্য যে, সমাজের বিশেষ শ্রেণির জন্য (যেমন প্রতিবন্ধী বা আদিবাসী) কোটা থাকা জরুরি। যেমন নারীদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে নারীদের সমস্যাগুলো বিবেচনায় নিয়ে তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা দরকার।
৪. বর্তমান প্রেক্ষাপট ও সংস্কার আন্দোলন
২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। ছাত্রছাত্রীরা কোটা বাতিলের চেয়ে সংস্কারের দাবিতেই বেশি সোচ্চার ছিল। তাদের দাবি ছিল—৫৬% কোটা কমিয়ে যৌক্তিক পর্যায়ে (১০-১৫%) নিয়ে আসা।
সম্প্রতি ২০২৪ সালেও কোটা পুনর্বহাল নিয়ে আদালতের রায়ের পর আবারও আন্দোলন শুরু হয়। শিক্ষার্থীরা চায় মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ হোক, তবে অনগ্রসরদের জন্য সামান্য কোটা থাকুক। এই আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের হতাশা থেকে সফলতার গল্প তৈরি করার অদম্য স্পৃহা দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোটা ব্যবস্থা চিরস্থায়ী হওয়া উচিত নয়। একটি নির্দিষ্ট সময় পর যখন পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী সমপর্যায়ে চলে আসবে, তখন কোটা তুলে দেওয়াই যুক্তিযুক্ত।
উপসংহার
কোটা ব্যবস্থা মূলত সাম্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি হাতিয়ার। কিন্তু এর অপরিকল্পিত প্রয়োগ বা রাজনৈতিক ব্যবহার উল্টো বৈষম্যের জন্ম দিতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মেধা ও কোটার একটি সুষম বণ্টন প্রয়োজন, যাতে রাষ্ট্র তার সেরা মেধাবীদের সেবা থেকে বঞ্চিত না হয় এবং একই সাথে পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা কত শতাংশ?
সাম্প্রতিক আন্দোলনের পর সরকার কোটা ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার করেছে। বর্তমানে ৯ম থেকে ১৩তম গ্রেডে মেধা ৯৩%, মুক্তিযোদ্ধা, নারী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটা ৫%, এবং প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ২% নির্ধারণ করা হয়েছে (তথ্য পরিবর্তনশীল হতে পারে)।
২. জেলা কোটা কী?
বাংলাদেশের সব জেলার উন্নয়ন সমান নয়। তাই পিছিয়ে পড়া জেলার প্রার্থীদের জন্য যে আসন সংরক্ষিত থাকে, তাকে জেলা কোটা বলে।
৩. কোটা কি সংবিধান পরিপন্থী?
না, বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮(৪) অনুচ্ছেদে বলা আছে—রাষ্ট্র নারী, শিশু বা অনগ্রসর নাগরিকদের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান (কোটা) প্রণয়ন করতে পারবে।
৪. প্রতিবন্ধী কোটা কি বাতিল হয়েছে?
না, প্রতিবন্ধীদের জন্য কোটা বাতিল করা হয়নি। মানবিক দিক বিবেচনায় এটি সবসময়ই বলবৎ রাখার পক্ষে মত দেন বিশেষজ্ঞরা।



