World War II soldiers and destruction history

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কেন হয়েছিল: কারণ, ইতিহাস ও বিস্তারিত বিশ্লেষণ

মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ এবং রক্তক্ষয়ী সংঘাত হিসেবে পরিচিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত চলা এই যুদ্ধে প্রায় ৬ কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। কিন্তু কেন এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল? এর পেছনে কি শুধুই অ্যাডলফ হিটলারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল, নাকি এর শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত ছিল?

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বনেতারা ভেবেছিলেন আর কখনো এমন যুদ্ধ হবে না। কিন্তু মাত্র ২০ বছরের ব্যবধানে পৃথিবী দেখল আরও ধ্বংসাত্মক রূপ। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ, রাজনৈতিক পটভূমি এবং এর ফলাফল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

১. ভার্সাই চুক্তির অপমান (Treaty of Versailles)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ রোপিত হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটা ‘ভার্সাই চুক্তি’র মধ্যেই। ১৯১৯ সালের এই চুক্তিতে জার্মানিকে যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ দায়ী করা হয় এবং তাদের ওপর চরম অপমানজনক শর্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়।

  • জার্মানির বিশাল ভূখণ্ড কেড়ে নেওয়া হয়।
  • তাদের সেনাবাহিনী ১ লক্ষে নামিয়ে আনা হয়।
  • বিপুল পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হয়, যা জার্মানির অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়।

এই অর্থনৈতিক ধস এবং জাতীয় অপমানের সুযোগ নিয়েই হিটলার জার্মানির ক্ষমতায় আসেন। জার্মানির মানুষ তখন হতাশা থেকে সফলতার গল্প খোঁজার বদলে প্রতিশোধের নেশায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে।

২. ফ্যাসিজম ও নাৎসিবাদের উত্থান

১৯৩০-এর দশকে ইউরোপে গণতন্ত্রের পতন ঘটে এবং একনায়কতন্ত্রের উত্থান হয়। জার্মানিতে অ্যাডলফ হিটলার এবং ইতালিতে বেনিতো মুসোলিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন।

হিটলারের আগ্রাসী মনোভাব

হিটলার বিশ্বাস করতেন জার্মান জাতি হলো ‘আর্য’ বা শ্রেষ্ঠ জাতি। তিনি জার্মানির হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের জন্য একে একে ভার্সাই চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করতে শুরু করেন এবং সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেন।

৩. লিগ অফ নেশনস-এর ব্যর্থতা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর শান্তি বজায় রাখার জন্য ‘লিগ অফ নেশনস’ গঠিত হয়েছিল। কিন্তু এটি ছিল দন্তহীন বাঘের মতো।

  • এর নিজস্ব কোনো সেনাবাহিনী ছিল না।
  • আমেরিকা এর সদস্য ছিল না।
  • জাপান যখন চীন আক্রমণ করে কিংবা ইতালি যখন ইথিওপিয়া দখল করে, তখন এই সংস্থা কিছুই করতে পারেনি।

৪. অক্ষশক্তি বনাম মিত্রশক্তি (Axis vs Allies)

যুদ্ধ শুরুর আগেই পৃথিবী দুটি প্রধান শিবিরে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। নিচে তাদের তালিকা দেওয়া হলো:

অক্ষশক্তি (Axis Powers) মিত্রশক্তি (Allied Powers)
জার্মানি (নেতৃত্বে: হিটলার) যুক্তরাজ্য (নেতৃত্বে: চার্চিল)
ইতালি (নেতৃত্বে: মুসোলিনি) সোভিয়েত ইউনিয়ন (নেতৃত্বে: স্ট্যালিন)
জাপান (নেতৃত্বে: হিরোহিতো) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (নেতৃত্বে: রুজভেল্ট)
হাঙ্গেরি, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া ফ্রান্স, চীন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া

৫. যুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণ: পোল্যান্ড আক্রমণ

সব প্রস্তুতির পর, ১লা সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করে। হিটলার ভেবেছিলেন অন্য দেশগুলো এবারও চুপ থাকবে। কিন্তু ৩রা সেপ্টেম্বর ব্রিটেন ও ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এভাবেই শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

যুদ্ধের ভয়াবহতা ছিল অকল্পনীয়। সাধারণ মানুষের ওপর চালানো গণহত্যা এবং যুদ্ধের কৌশল কতটা নৃশংস হতে পারে, তা আমরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও দেখেছি। যেমন, অপারেশন সার্চলাইট এর হত্যাকাণ্ডের খবর পড়লে যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

যুদ্ধের ফলাফল ও পরবর্তী প্রভাব

১৯৪৫ সালে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলার মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। যুদ্ধের ফলে ইউরোপের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যায়, এবং বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন দুটি সুপারপাওয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়।

যুদ্ধের কারণে জনসংখ্যায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। বিপুল সংখ্যক পুরুষ মারা যাওয়ার ফলে জনসংখ্যায় নারী ও পুরুষের সংখ্যার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় অনেক দেশে।

উপসংহার

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে যে উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং ঘৃণা কখনোই ভালো কিছু বয়ে আনে না। বর্তমান বিশ্বে শান্তি বজায় রাখার জন্য এই ইতিহাসের শিক্ষা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। জাতিসংঘ বা ইউনাইটেড নেশনস-এর জন্ম হয়েছিল এই যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকেই, যেন পৃথিবী আর কখনো এমন বিভীষিকা না দেখে।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কত বছর স্থায়ী ছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত মোট ৬ বছর স্থায়ী ছিল।

২. আমেরিকা কেন যুদ্ধে জড়িয়েছিল?

প্রথমে আমেরিকা নিরপেক্ষ ছিল। কিন্তু ১৯৪১ সালে জাপান আমেরিকার পার্ল হারবারে আক্রমণ করলে আমেরিকা সরাসরি যুদ্ধে যোগ দেয়।

৩. হলোকাস্ট (Holocaust) কী?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনী কর্তৃক প্রায় ৬০ লক্ষ ইহুদিকে গ্যাস চেম্বারে এবং কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে হত্যা করার ঘটনাকে হলোকাস্ট বলা হয়।

৪. এই যুদ্ধে কারা জয়ী হয়েছিল?

এই যুদ্ধে মিত্রশক্তি (যুক্তরাজ্য, আমেরিকা, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ফ্রান্স) জয়ী হয়েছিল এবং অক্ষশক্তি (জার্মানি, জাপান, ইতালি) পরাজিত হয়েছিল।

Leave a Comment

Scroll to Top