মোটা হবো কিভাবে: স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে ওজন বৃদ্ধির সহজ ও কার্যকর গাইড
ওজন কমানোর মতোই ওজন বাড়ানো বা স্বাস্থ্য ভালো করা অনেকের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেকেই আছেন যারা প্রচুর খাবার খাওয়ার পরেও শরীরে মাংস লাগে না বা ওজন বাড়ে না। আপনি যদি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের রুগ্ন শরীর দেখে হীনম্মন্যতায় ভোগেন এবং মোটা হবো কিভাবে—এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন, তবে এই গাইডটি আপনার জন্য।
ওজন বৃদ্ধি করা মানে শুধুই চর্বি বা ফ্যাট বাড়ানো নয়, বরং শরীরের পেশী (Muscle) বৃদ্ধি করে একটি সুঠাম দেহ গঠন করা। অপরিকল্পিতভাবে ফাস্টফুড খেয়ে মোটা হলে তা বিভিন্ন রোগের কারণ হতে পারে। তাই আমাদের লক্ষ্য হলো স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে ওজন বাড়ানো।
কেন আপনার ওজন বাড়ছে না? (Understanding the Cause)
ওজন বাড়ানোর চেষ্টা করার আগে জানা দরকার কেন আপনার ওজন বাড়ছে না। এর পেছনে জেনেটিক কারণ, উচ্চ মেটাবলিজম, বা কোনো গোপন শারীরিক অসুস্থতা থাকতে পারে।
অনেকেই অভিযোগ করেন, “আমি তো সারাদিন খাই, তবুও মোটা হই না।” এর আসল কারণ হতে পারে আপনার শরীরের ক্যালোরি বার্ন করার ক্ষমতা অনেক বেশি অথবা আপনি সঠিক পুষ্টি পাচ্ছেন না। বিস্তারিত জানতে পড়তে পারেন: খাওয়ার পরেও মোটা না হওয়ার কারণ।
এছাড়া মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তাও ওজন না বাড়ার একটি বড় কারণ। অতিরিক্ত টেনশন মেটাবলিজম রেট বাড়িয়ে দেয়, ফলে ওজন কমে যায়।
ওজন বৃদ্ধির মূল মন্ত্র: ক্যালোরি সারপ্লাস (Caloric Surplus)
মোটা হওয়ার বিজ্ঞজ্ঞান খুব সহজ—আপনি সারাদিনে যতটুকু ক্যালোরি খরচ করেন, তার চেয়ে বেশি ক্যালোরি গ্রহণ করতে হবে। একে বলা হয় ‘Caloric Surplus’।
- ধীরে ওজন বাড়াতে চাইলে: প্রতিদিনের চাহিদার চেয়ে ৩০০-৫০০ ক্যালোরি বেশি খান।
- দ্রুত ওজন বাড়াতে চাইলে: প্রতিদিনের চাহিদার চেয়ে ৭০০-১০০০ ক্যালোরি বেশি খান।
তবে ক্যালোরি বাড়ানোর মানে এই নয় যে আপনি ভাজা-পোড়া খেয়ে পেট ভরাবেন। আপনাকে বেছে নিতে হবে পুষ্টিকর এবং উচ্চ ক্যালোরিযুক্ত খাবার। একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলাই হলো আসল চাবিকাঠি।
ওজন বাড়াতে যা খাবেন: সেরা খাবারের তালিকা
নিচে এমন কিছু খাবারের তালিকা দেওয়া হলো যা স্বাস্থ্যকর উপায়ে ওজন বাড়াতে সাহায্য করে।
| খাদ্যের ধরন | খাবারের নাম | উপকারিতা |
|---|---|---|
| কার্বোহাইড্রেট | ভাত, রুটি, আলু, ওটস, মিষ্টি আলু | দ্রুত শক্তি যোগায় ও ওজন বাড়ায়। |
| প্রোটিন | ডিম, মুরগির মাংস, মাছ, ডাল, পনির | পেশী বা মাসল (Muscle) তৈরি করতে সাহায্য করে। |
| স্বাস্থ্যকর ফ্যাট | বাদাম, পিনাট বাটার, অলিভ অয়েল, অ্যাভোকাডো | অল্প পরিমাণে খেলেও প্রচুর ক্যালোরি পাওয়া যায়। |
| দুগ্ধজাত খাবার | দুধ, দই, মাখন, ঘি | ক্যালসিয়াম ও প্রোটিনের উৎস। |
শরীরের দুর্বলতা কাটাতে এবং পুষ্টির চাহিদা মেটাতে কী খাবেন তা নিয়ে চিন্তিত থাকলে দেখে নিন: শরীর দুর্বল হলে কি খেতে হয়।
ধাপে ধাপে মোটা হওয়ার কার্যকর পদ্ধতি
১. প্রোটিন গ্রহণের পরিমাণ বাড়ান
পেশী তৈরির মূল উপাদান হলো প্রোটিন। আপনি যদি অতিরিক্ত ক্যালোরি খান কিন্তু প্রোটিন না খান, তবে সেই ক্যালোরি চর্বি হিসেবে জমা হবে। প্রতি কেজি ওজনের জন্য ১.৫ থেকে ২ গ্রাম প্রোটিন খাওয়ার চেষ্টা করুন।
২. কার্বোহাইড্রেট ও ফ্যাট খেতে ভয় পাবেন না
ওজন কমাতে যারা চান, তারা কার্বোহাইড্রেট এড়িয়ে চলেন। কিন্তু ওজন বাড়াতে হলে আপনাকে প্রচুর ভাত, রুটি ও ফ্যাটজাতীয় খাবার খেতে হবে। অন্তত তিন বেলা ভরপেট খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন এবং মাঝখানের সময়ে ভারী নাস্তা করুন।
৩. লিকুইড ক্যালোরি বা পানীয়
শক্ত খাবার চিবিয়ে খাওয়া অনেক সময় কঠিন হতে পারে। সেক্ষেত্রে স্মুদি বা শেক বানিয়ে খাওয়া সহজ। দুধ, কলা, বাদাম এবং প্রোটিন পাউডার দিয়ে তৈরি শেক ওজন বাড়াতে জাদুর মতো কাজ করে। ঘরোয়া উপায়ে হজম শক্তি বাড়াতে এবং ওজন বৃদ্ধিতে জিরা পানি খাওয়ার নিয়ম জেনে নিতে পারেন, যা পরোক্ষভাবে ক্ষুধামন্দা দূর করতে পারে।
৪. ভারী ব্যায়াম বা স্ট্রেন্থ ট্রেনিং (Strength Training)
অনেকেই ভাবেন জিমে গেলে মানুষ চিকন হয়ে যায়। এটি ভুল ধারণা। কার্ডিও (Cardio) বা দৌড়াদৌড়ি করলে ওজন কমে, কিন্তু ভারী ওজন তুললে (Weight Lifting) পেশী বড় হয় এবং ওজন বাড়ে। সপ্তাহে ৩-৪ দিন ভারী ব্যায়াম করুন। শরীরের যত্ন এবং সঠিক ব্যায়াম সম্পর্কে জানতে পড়ুন: শরীর এর যত্ন কিভাবে নিতে হয়।
জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং ঘুম
ঘুমের মধ্যে আমাদের শরীরের পেশী গঠিত হয়। আপনি যদি প্রচুর খান ও ব্যায়াম করেন কিন্তু রাতে ঠিকমতো না ঘুমান, তবে ওজন বাড়বে না। দিনে অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম নিশ্চিত করুন।
অনেক সময় ভিটামিনের অভাবেও শরীর শুকিয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে নখ বা চুলের সমস্যা দেখা দিলে বুঝতে হবে শরীরে পুষ্টির ঘাটতি আছে। এ বিষয়ে আরও জানুন: কোন ভিটামিনের অভাবে নখের সমস্যা হয়।
যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন
- খাওয়ার আগে পানি পান করা: খাওয়ার আগে পানি খেলে পেট ভরে যায় এবং বেশি খাওয়া যায় না।
- অনিয়মিত খাওয়া: আজ বেশি খেলেন, কাল কম—এভাবে ওজন বাড়বে না। ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।
- শুধুমাত্র জাঙ্ক ফুড খাওয়া: বার্গার বা পিৎজা খেয়ে ওজন বাড়ানো যায়, কিন্তু এতে হার্টের ক্ষতি হয় এবং পেটে চর্বি জমে।
উপসংহার
মোটা হওয়া বা ওজন বৃদ্ধি করা একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। রাতারাতি ফল পাওয়ার আশা না করে স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত ঘুমের ওপর মনোযোগ দিন। আপনার যদি কোনো বিশেষ শারীরিক সমস্যা থাকে, তবে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। নিজেকে ভালোবাসুন এবং ধৈর্যের সাথে নিয়ম মেনে চলুন, ফলাফল অবশ্যই পাবেন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. কত দিনে ওজন বাড়ানো সম্ভব?
সঠিক ডায়েট এবং ব্যায়াম মেনে চললে এক মাসে ২-৩ কেজি ওজন বাড়ানো সম্ভব। তবে এটি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে।
২. শুধু কি ভাত খেলেই মোটা হওয়া যায়?
না, শুধু ভাত খেলে শরীরে শর্করা বাড়ে কিন্তু পেশী বাড়ে না। পেশী বৃদ্ধির জন্য ভাতের সাথে মাছ, মাংস, ডিম ও ডাল পর্যাপ্ত পরিমাণে খেতে হবে।
৩. ব্যায়াম করলে কি ওজন কমে যায়?
কার্ডিও ব্যায়াম করলে ওজন কমে, কিন্তু ওয়েট লিফটিং বা ভারী ব্যায়াম করলে পেশী গঠিত হয় এবং ওজন বাড়ে।
৪. কোনো ঔষধ খেয়ে কি দ্রুত মোটা হওয়া উচিত?
ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো মোটা হওয়ার ঔষধ খাওয়া উচিত নয়। বাজারের সস্তা ঔষধে স্টেরয়েড থাকতে পারে যা কিডনি ও লিভারের মারাত্মক ক্ষতি করে।
৫. রাতে দেরি করে ঘুমালে কি ওজন কমে?
হ্যাঁ, অপর্যাপ্ত ঘুম মেটাবলিজম ব্যাহত করে এবং কর্টিসল হরমোন বাড়িয়ে দেয়, যা পেশী ক্ষয় করতে পারে।



