Earthquake causes and tectonic plates diagram

ভূমিকম্প কেন হয়: বৈজ্ঞানিক কারণ, প্রক্রিয়া ও বাঁচার উপায়

প্রকৃতির অন্যতম রহস্যময় এবং ধ্বংসাত্মক শক্তি হলো ভূমিকম্প। কোনো পূর্বভাস ছাড়াই মাটি কেঁপে ওঠে, মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়ে বিশাল অট্টালিকা। কিন্তু আপনি কি কখনো ভেবেছেন, আমাদের এই শক্ত পৃথিবী হঠাৎ কেন কেঁপে ওঠে? ভূমিকম্প কেন হয়—এটি কি শুধুই প্রকৃতির খেয়াল, নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীর কোনো বৈজ্ঞানিক কারণ?

আজকের এই আর্টিকেলে আমরা মাটির গভীরের টেকটোনিক প্লেট থেকে শুরু করে মনুষ্যসৃষ্ট কারণগুলো বিশ্লেষণ করব। সেই সাথে জানব বাংলাদেশ কেন ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে আছে এবং এর থেকে বাঁচার উপায় কী।

১. ভূমিকম্পের মূল কারণ: টেকটোনিক প্লেট (Plate Tectonics)

পৃথিবীর উপরিভাগ অখণ্ড নয়; এটি বেশ কিছু বড় বড় খণ্ডে বিভক্ত, যাকে বলা হয় ‘টেকটোনিক প্লেট’। এই প্লেটগুলো পৃথিবীর গভীরে থাকা তরল লাভা বা ম্যাগমার ওপর ভাসছে।

সহজ কথায়, একটি পুকুরে ভাসমান থার্মোকলের টুকরোগুলোর মতো এই প্লেটগুলো সবসময় নড়াচড়া করছে। যখন দুটি প্লেট একে অপরের সাথে ধাক্কা খায় বা ঘষা লাগে, তখন বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয়। এই শক্তি তরঙ্গ আকারে ছড়িয়ে পড়লেই আমরা ভূমিকম্প অনুভব করি।

পৃথিবীর গঠন এবং এই প্লেটগুলোর অবস্থান বোঝা অনেকটা মহাসাগর কয়টি ও কি কি তা জানার মতোই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অধিকাংশ প্লেট সংযোগস্থল সাগরের তলদেশেই অবস্থিত।

প্লেটগুলোর নড়াচড়ার ধরণ:

  • Divergent: যখন দুটি প্লেট একে অপরের থেকে দূরে সরে যায়।
  • Convergent: যখন দুটি প্লেট একে অপরের দিকে এগিয়ে আসে এবং সংঘর্ষ হয়। (সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প এতেই হয়)।
  • Transform: যখন দুটি প্লেট পাশাপাশি ঘষা খেয়ে চলে যায়।

২. প্রাকৃতিক বনাম মনুষ্যসৃষ্ট কারণ

বেশিরভাগ ভূমিকম্প প্রাকৃতিকভাবে হলেও, বর্তমানে মানুষের কিছু কর্মকাণ্ডও এর জন্য দায়ী।

প্রাকৃতিক কারণ মনুষ্যসৃষ্ট কারণ
টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষ পাহাড় কেটে জনবসতি স্থাপন
আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত নদীতে বাঁধ দেওয়া বা জলাধার নির্মাণ
শিলাচ্যুতি বা ফাটল (Fault Line) খনিজ উত্তোলনের জন্য মাটির গভীরে বিস্ফোরণ (Fracking)

বর্তমানে মানুষ কিভাবে পরিবেশ পরিবর্তন করছে তার একটি ভয়াবহ উদাহরণ হলো এই কৃত্রিম ভূমিকম্প। মাটির নিচ থেকে গ্যাস বা তেল তোলার ফলে যে শূন্যস্থান সৃষ্টি হয়, তা অনেক সময় ধসে গিয়ে কম্পন সৃষ্টি করে।

৩. ভূমিকম্পের প্রক্রিয়া: ফোকাস ও এপিসেন্টার

ভূমিকম্প যেখানে উৎপত্তি হয়, মাটির গভীরের সেই স্থানটিকে বলা হয় Focus বা কেন্দ্র। আর কেন্দ্রের ঠিক সোজাসুজি ওপরে ভূপৃষ্ঠের যে স্থানটি থাকে, তাকে বলা হয় Epicenter বা উপকেন্দ্র। এপিসেন্টারেই কম্পন সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়।

অনেকটা যেভাবে কয়লা মাটির গভীরে হাজার বছর ধরে চাপে সৃষ্টি হয় (কয়লা কিভাবে সৃষ্টি হয়), তেমনই ভূ-অভ্যন্তরে দীর্ঘদিনের জমে থাকা চাপ হঠাৎ মুক্তি পেলে এই কম্পন সৃষ্টি হয়।

৪. বাংলাদেশ কেন ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে?

বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে ইন্ডিয়ান প্লেট এবং ইউরেশিয়ান প্লেটের সংযোগস্থলের খুব কাছে অবস্থিত। বিশেষ করে সিলেট এবং চট্টগ্রাম অঞ্চল ডাউকি ফল্ট (Dauki Fault) এর কাছাকাছি হওয়ায় মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

সতর্কতা: বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যেকোনো সময় বড় মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকা শহরের অপরিকল্পিত ভবনগুলো ধসে পড়তে পারে। তাই আগে থেকেই নিরাপদ থাকার ৫টি উপায় জেনে রাখা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব।

৫. ভূমিকম্প হলে কী করবেন?

ভূমিকম্প আটকানোর ক্ষমতা মানুষের নেই, কিন্তু সচেতন হলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমানো সম্ভব।

  • Drop, Cover, and Hold On: কম্পন শুরু হলে মেঝতে বসে পড়ুন, শক্ত টেবিলের নিচে আশ্রয় নিন এবং টেবিলটি শক্ত করে ধরে রাখুন।
  • আতঙ্কিত হবেন না: তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ি দিয়ে নামবেন না বা লাফ দেবেন না। হতাশা বা ভয় কাটিয়ে মাথা ঠান্ডা রাখাটাই তখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
  • গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইন: কম্পন থামলে দ্রুত গ্যাসের চুলা এবং মেইন সুইচ বন্ধ করে দিন।

উপসংহার

ভূমিকম্প প্রকৃতির একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যা পৃথিবীকে তার ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। তবে অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং পরিবেশ ধ্বংসের কারণে এর ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে। আমরা যদি প্রকৃতির নিয়ম মেনে চলি এবং দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকি, তবে জীবন রক্ষা করা সম্ভব। মনে রাখবেন, দুর্যোগ বলে আসে না, তাই প্রস্তুতিই একমাত্র রক্ষাকবচ।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. ভূমিকম্পের পূর্বাভাস কি আগে থেকে জানা সম্ভব?

না, এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানে ভূমিকম্পের সঠিক সময় এবং স্থান আগে থেকে নিখুঁতভাবে বলার মতো প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয়নি।

২. রিখটার স্কেল কী?

ভূমিকম্পের তীব্রতা বা শক্তি মাপার যন্ত্রের নাম সিসমোগ্রাফ, আর যে এককে মাপা হয় তাকে রিখটার স্কেল (Richter Scale) বলে।

৩. ভূমিকম্প হলে কি লিফট ব্যবহার করা যাবে?

কখনোই না। ভূমিকম্পের সময় বিদ্যুৎ চলে যেতে পারে বা লিফট ছিঁড়ে পড়তে পারে। তাই সবসময় সিঁড়ি ব্যবহার করা উচিত।

৪. দিনে নাকি রাতে ভূমিকম্প বেশি বিপজ্জনক?

রাতে মানুষ ঘুমে থাকে বলে প্রতিক্রিয়া দেখাতে দেরি হয়, তাই রাতের ভূমিকম্পে প্রাণহানির আশঙ্কা সাধারণত বেশি থাকে।

Leave a Comment

Scroll to Top