এশার নামাজ ৯ রাকাত কি কি: নিয়ম, নিয়ত ও বিস্তারিত আলোচনা
দিন শেষের ক্লান্তি ভুলে মহান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের শেষ সুযোগ হলো এশার নামাজ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মধ্যে এশার নামাজের গুরুত্ব অপরিসীম। অনেকেই কর্মব্যস্ততার কারণে বা ক্লান্তির অজুহাতে এই নামাজটি অবহেলা করেন। আবার অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, এশার নামাজ ৯ রাকাত কি কি এবং এটি আদায়ের সঠিক নিয়ম কী?
সাধারণত এশার নামাজে মোট রাকাত সংখ্যা নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও, মূল বা আবশ্যিক অংশ হিসেবে ৯ রাকাতকে গণ্য করা হয়। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা এশার নামাজের রাকাত বিন্যাস, নিয়ত এবং বেতের নামাজের নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত জানব।
এশার নামাজের রাকাত হিসাব (Rakat Breakdown)
এশার নামাজ মূলত ৪ রাকাত ফরজ দিয়ে শুরু হয়। তবে সুন্নাত ও বেতের মিলিয়ে এর পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। অনেকে মোট ১৫ রাকাত বা ১৩ রাকাত পড়েন, তবে যারা সময়ের অভাবে সংক্ষেপে পড়তে চান, তারা মূলত ৯ রাকাত আদায় করেন।
| ক্রমিক | নামাজের ধরণ | রাকাত সংখ্যা | গুরুত্ব |
|---|---|---|---|
| ১ | ফরজ (Fard) | ৪ রাকাত | অবশ্যই পড়তে হবে (আবশ্যিক) |
| ২ | সুন্নতে মুয়াক্কাদা (Sunnah) | ২ রাকাত | রাসূল (সা.) নিয়মিত পড়তেন |
| ৩ | বেতের/ওয়াজিব (Witr) | ৩ রাকাত | অবশ্যই পড়তে হবে (ওয়াজিব) |
| মোট | সংক্ষিপ্ত এশা | ৯ রাকাত | সাধারণ আমল |
এছাড়াও ফরজের আগে ৪ রাকাত সুন্নতে গায়ের মুয়াক্কাদা এবং বেতেরের পরে ২ রাকাত নফল পড়ার বিধান রয়েছে। তবে ৯ রাকাত হলো সেই অংশ যা সাধারণত জামাতে বা একাকী আবশ্যিকভাবে আদায় করা হয়।
৯ রাকাত নামাজের ধারাবাহিক নিয়ম ও নিয়ত
১. ৪ রাকাত ফরজ নামাজ
এশার ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পর প্রথমে ৪ রাকাত ফরজ নামাজ আদায় করতে হয়। এটি জামাতে পড়া উত্তম। একাকী পড়লে সূরা ফাতিহার সাথে অন্য সূরা মিলাতে হবে (প্রথম দুই রাকাতে)।
অর্থ: আমি আল্লাহর ওয়াস্তে এশার ৪ রাকাত ফরজ নামাজ কেবলামুখী হয়ে আদায়ের নিয়ত করলাম।
২. ২ রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা
ফরজ নামাজের পর ২ রাকাত সুন্নত নামাজ আদায় করতে হয়। এটি রাসূল (সা.) কখনো ছাড়তেন না। এই নামাজের নিয়ম সাধারণ ২ রাকাত নামাজের মতোই।
৩. ৩ রাকাত বেতের (ওয়াজিব) নামাজ
এশার নামাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কিছুটা ভিন্নধর্মী অংশ হলো বেতের নামাজ। এটি ৩ রাকাত বিশিষ্ট এবং শেষ রাকাতে ‘দোয়া কুনুত’ পড়া ওয়াজিব।
বেতের নামাজ পড়ার সঠিক নিয়ম ও দোয়া কুনুত
অনেকেই বেতের নামাজের নিয়ম নিয়ে দ্বিধায় থাকেন। ৩য় রাকাতে সূরা মিলানোর পর, রুকুতে না গিয়ে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে হাত কানের লতি পর্যন্ত উঠিয়ে আবার বাঁধতে হয়। এরপর দোয়া কুনুত পড়তে হয়।
আল্লাহুম্মা ইন্না নাস্তাঈনুকা, ওয়া নাস্তাগফিরুকা, ওয়া নু’মিনু বিকা, ওয়া নাতাওয়াক্কালু ‘আলাইকা…
যারা দোয়া কুনুত পারেন না, তারা রিজিক বৃদ্ধির দোয়া বা ‘রব্বানা আতিনা…’ আয়াতটি পড়তে পারেন। তবে দোয়া কুনুত শিখে নেওয়া উত্তম।
এশার নামাজের পর করণীয় আমল
এশার নামাজ শেষে ঘুমানোর আগে কিছু আমল করা সুন্নত। এটি মানসিক প্রশান্তি দেয় এবং শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচায়।
- আয়াতুল কুরসি পাঠ: রাতে ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি বাংলা উচ্চারণসহ পড়লে সারারাত ফেরেশতারা পাহারায় থাকে।
- সূরা মুলক পাঠ: কবরের আজাব থেকে মুক্তি পেতে এই সূরাটি খুবই কার্যকরী।
- অজু অবস্থায় ঘুমানো: পবিত্র অবস্থায় ঘুমানো সুন্নত। তবে ঘুমের ঘোরে অজু ভেঙে গেলে কি করবেন তা জানতে পড়ুন: মহিলাদের অজু ভঙ্গের কারণ।
এছাড়া যাদের রাতে খারাপ স্বপ্ন দেখার অভ্যাস আছে বা মানসিক চাপে ভোগেন, তারা মাথা থেকে বাজে চিন্তা দূর করার দোয়া পড়ে ঘুমাতে পারেন।
তাহাজ্জুদ ও এশার নামাজের সম্পর্ক
আপনি যদি শেষ রাতে তাহাজ্জুদ পড়ার নিয়ত করেন, তবে বেতের নামাজ তখন এশার সাথে না পড়ে তাহাজ্জুদের পরে পড়া উত্তম। আর যদি ওঠার নিশ্চয়তা না থাকে, তবে ঘুমানোর আগেই পড়ে নেওয়া ভালো। বিস্তারিত জানতে দেখুন: মহিলাদের তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ম।
উপসংহার
এশার নামাজ মুমিনের জন্য দিনের শেষ ইবাদত। এটি ঠিকমতো আদায় করলে সারারাত ইবাদতের সওয়াব পাওয়া যায়। ব্যস্ততার অজুহাতে নামাজ কাজা না করে অন্তত ফরজ, সুন্নত ও বেতের মিলিয়ে ৯ রাকাত আদায় করার চেষ্টা করুন। আল্লাহ আমাদের সকলকে নিয়মিত নামাজ আদায়ের তৌফিক দান করুন। আমিন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. এশার নামাজ কখন পড়া যায়?
মাগরিবের ওয়াক্ত শেষ হওয়ার পর থেকে সুবহে সাদিকের আগ পর্যন্ত এশার নামাজ পড়া যায়। তবে মধ্যরাতের আগে পড়ে নেওয়া উত্তম।
২. শুধু ফরজ ও বেতের পড়লে কি নামাজ হবে?
হ্যাঁ, ফরজ এবং বেতের (ওয়াজিব) আদায় করলে মূল দায়িত্ব পালন হয়ে যাবে, তবে সুন্নতে মুয়াক্কাদা ছেড়ে দেওয়া উচিত নয় কারণ এতে সওয়াব কমে যায়।
৩. বেতের নামাজ কি কাজা করা লাগে?
হ্যাঁ, বেতের নামাজ ওয়াজিব। তাই এটি ছুটে গেলে কাজা আদায় করতে হবে।
৪. দোয়া কুনুত না পারলে কি বেতের হবে?
দোয়া কুনুত না পারলে সহজ কোনো দোয়া বা ‘রব্বানা আতিনা…’ পড়লেও নামাজ আদায় হয়ে যাবে। তবে শেখার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।



